কোন রান্নার তেল ক্যান্সার রোগীদের জন্য সেরা?

by Team Onco
82 views

রান্নার তেল (Cooking oil) নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন থাকে। তেল ছাড়া রান্না করবেন কিনা কিংবা রান্নায় তেল বেশি হয়ে যাচ্ছে না তো? বিশেষ করে ক্যান্সারের রোগীদের (cancer patient) মনে এই ধরনের দ্বিধা দেখা দেয় স্বাস্থ্যের কথা ভেবে। কারণ ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে কী খাবার খাচ্ছেন সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র খাবার সুস্বাদু হলেই চলবে না স্বাস্থ্যকরও হতে হবে।

একজন অনকোলজি ডায়েটিশিয়ান (oncology dietician) হিসাবে, রোগীদের কাছ থেকে হামেশায় আমি যে প্রশ্নগুলি পায় তারমধ্যে অন্যতম হল রান্নার তেল সম্পর্কে। বেশিরভাগ ভারতীয় রান্না তেল ছাড়া প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে বাঙালির রান্নাঘরে তেল ছাড়া কী চলে! তবে শরীরের সুস্থতার কথাও মাথায় রাখতে হবে। সুতরাং এমন তেল বেছে নিতে হবে যা থেকে আপনি উপকার পাবেন। 

কিভাবে সেরা রান্নার তেল বেছে নেবেন?

প্রথম যে জিনিসটি বুঝতে হবে সেটা হল, এমন কোনও তেল নেই যা সব ধরণের রান্নার জন্য উপযুক্ত। সবকিছুর জন্য শুধুমাত্র এক ধরনের বা একই ব্র্যান্ডের তেল ব্যবহার না করে আপনার রান্নায় তেলের সংমিশ্রণ ব্যবহার করতে পারেন, তা অনেকবেশি উপকারী। এবার দেখে নিন কোন তেল ভালো।

রান্নায় তেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একবার যদি আপনি এই বিষয়টি বুঝতে পারেন, তাহলে জানতে পারবেন কোন তেল আপনার পরিবারের প্রয়োজনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। 

তেলের স্মোকিং পয়েন্ট

বিষয়টি সহজ ভাষায় বললে, স্মোকিং পয়েন্ট বলতে বোঝায় সেই তাপমাত্র যখন তেল গরম হয় এবং ধোঁয়া উঠতে শুরু করে। ধোঁয়া ওঠা মানে তেল জ্বলতে শুরু করেছে, যা মোটেও ভালো নয়।

যখন তেলে ধোঁয়া উঠতে শুরু করে তখন এর রাসায়নিক গঠন ভেঙে যায় এবং এটি আপনার খাবারে ফ্রি র‌্যাডিক্যাল নামক ক্ষতিকারক রাসায়নিক নির্গত করতে শুরু করে। আপনি লক্ষ্য করবেন যে এই জাতীয় তেল দিয়ে রান্না করা খাবারের স্বাদ খানিকটা তিতকুটে। সেই খাবার আপনার স্বাস্থ্যের জন্যেও ক্ষতিকর।

রান্নার তেল

বিভিন্ন তেলে বিভিন্ন তাপমাত্রায় ধোঁয়া ওঠে। আসুন দেখে নি সাধারণ কিছু উদাহরণ।

অলিভ অয়েল (Olive oil) প্রায় 240 ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তাপমাত্রায় ধোঁয়া উঠতে শুরু করে। এর মানে আপনি এটিকে শুধুমাত্র কম থেকে মাঝারি আঁচে গরম করতে পারবেন। এটি স্যালাড ড্রেসিং এবং হালকা রান্নার জন্য ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো।

পিনাট অয়েল এবং ঘি (Peanut oil and ghee) 230 ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধোঁয়া ছেড়ে দেয়। 225 ডিগ্রি সেলসিয়ালে সূর্যমুখী তেলে (Sunflower oils) ধোঁয়া ওঠে। সুতরাং, এই তেলগুলি সাধারণত ভারতীয় রান্নায় ব্যবহার করা যেতে পারে যেমন তরকারি এবং ভাজাভুজি করতে।

নারকেল তেল (Coconut oil) 175 ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম হয়ে যায়। সুতরাং এটি ডিপ ফ্রাই করার জন্য উপযুক্ত।

এখানে অন্যান্য জনপ্রিয় কিছু তেলের স্মোকিং পয়েন্ট তুলে ধরা হল:

তেলের প্রকার                                        সেন্টিগ্রেডে স্মোকিং পয়েন্ট
রাইস ব্রান অয়েল                                   260°C
ভেজিটেবল অয়েল                                205 – 230°C
তিলের তেল                                           175 – 210°C
বাটার                                                     175°C

তেলের পুষ্টির মান

রান্নার সঠিক তেল বেছে নেওয়ার আরেকটি কারণ হল এটি আপনার শরীরকে পুষ্টি জোগাবে। সমস্ত তেল ফ্যাটের মধ্যে পরে এবং ফ্যাট শরীরকে ভিটামিন A, D, E এবং K শোষণ করতে সাহায্য করে। তবে, কিছু তেল অন্যদের তুলনায় আপনার খাবারে আরও বেশি পুষ্টি যোগ করে।

অলিভ অয়েল

অলিভ অয়েল পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং খারাপ কোলেস্টেরল কমানোর সাথে সাথে আপনার শরীরে ভালো কোলেস্টেরল বাড়ায়। এটি হজমে সাহায্য করে এবং পেটের আলসারের সমস্যা দূর করে।

তাহলে নিশ্চয় বুঝতেই পারছেন অলিভ অয়েল ব্যবহারের অনেক কারণ রয়েছে। তবে আপনাকে মনে রাখতে হবে যে আপনি যদি অলিভ অয়েলকে খুব বেশি গরম করেন তাহলে ধোঁয়া উঠে যাবে। আর একবার ধোঁয়া উঠলে এর পুষ্টিগত মান হারিয়ে যাবে। তাই কেবল মাত্র স্যালাড ড্রেসিংয়ের জন্য ব্যবহার করুন এবং এটি শুধুমাত্র কম ও মাঝারি তাপমাত্রা গরম করুন।

আরেকটি তেল যা স্যালাড ড্রেসিংয়ের জন্য ব্যবহার করতে পারেন সেটা হল ফ্ল্যাক্সসিড তেল (flaxseed oil)। এটি ওমেগা 3 ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ যা একে পুষ্টিকর করে তোলে। তবে এটি খুব বেশি গরম করা উচিত নয়।

পিনাট তেল, তিলের তেল এবং ক্যানোলা তেলের মতো তেলগুলি মোনো এবং পলিঅ্যানস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ যা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এগুলি সাধারণত ভারতীয় রান্নায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

নারকেল তেলে 90% স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে যা এটিকে অস্বাস্থ্যকর করে তোলে, তবে মাঝেমধ্যে ডিপ ফ্রাই করার জন্য এই তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।

সরষের তেল বাঙালির রান্নাঘর মানেই সরষের তেল মাস্ট। সে গরম মাছ শেষে শুরু করে সরষে ইলিশ, সরষের তেল ছাড়া বাঙালি রান্না একেবারে অসম্পূর্ণ। এবার জেনে নিন সরষের তেলের পুষ্টিগত মান- 

  • এক টেবিল চামচ সরষের তেলে রয়েছে 130 kcal ক্যালোরি। 
  • সরষের তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম থাকে এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড সামঞ্জস্যপূর্ণ অনুপাতে থাকে। 
  • এতে ট্র্যান্স ফ্যাট নেই। 
  • এতে ওমেগা 3 এবং ওমেগা 6 লিনোলেনিক অ্যাসিড রয়েছে। 
  • এলার্জির সমস্যা থাকলে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন এই তেল ব্যবহার করা যাবে কিনা। 
  • এতে ইউরিকিক অ্যাসিড, অতিরিক্ত খেলে শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইড ও এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায় এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। 

স্বাদ

সব তেলের স্বাদ একই রকম হয় না এবং আপনি যে তেল ব্যবহার করেন তা খাবারের স্বাদ পরিবর্তন করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, নারকেল তেলের একটি শক্তিশালী এবং সতন্ত্র গন্ধ রয়েছে যা সহজেই সনাক্ত করা যায়। পিনাট অয়েলের অয়েলের অকটি অবিশ্বাস্য চিনাবাদামের গন্ধ রয়েছে এবং তিলের তেলেও বাদামের স্বাদ রয়েছে। যা খাবারে অন্য স্বাদ যোগ করে।

সূর্যমুখী তেল, উদ্ভিজ্জ তেল এবং ক্যানোলা তেলের মতো অন্যান্য তেলগুলির প্রায় কোনও গন্ধ নেই এবং আপনি এগুলিতে যা কিছু রান্না করবেন তার মতোই স্বাদ হবে, বিশেষ কোনও পার্থক্য ছাড়াই।

খাবারের স্বাদ ব্যক্তি এবং পরিবার ভিত্তিক আলাদা আলাদা হয়। বেশিরভাগ লোক নির্দিষ্ট ধরণের রান্নার তেলের স্বাদে অভ্যস্ত এবং অন্য কোনও তেলের রান্না তাদের পছন্দ নাও হতে পারে।

উপরের বিষয়গুলির উপর ভিত্তি করে আপনার রান্নার তেল বেছে নিন। যা আপনার এবং আপনার পরিবারের জন্য উপযুক্ত।

তেলের পরিমাণ

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে হল রান্নায় ব্যবহৃত তেলের পরিমাণ। প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ৩ চা চামচ রান্নার তেল খেতে পারেন। এর অর্থ হল, এক মাসে একজন প্রাপ্তবয়স্ত ব্যক্তির আধা লিটারের বেশি তেল খাওয়া উচিত নয়। সদস্য সংখ্যার উপর ভিত্তি করে আপনি আপনার পরিবারের মাসিক তেলের প্রয়োজনীয়তা গণনা করতে পারেন।

আপনি যদি আপনার পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি আধা লিটারের বেশি তেল ব্যবহার করেন, তবে আপনার তেল খরচ কমানোর উপায়গুলি দেখতে হবে। এটি করার জন্য এখানে কিছু টিপস রয়েছে:

  • বেশ কিছু খাবার রয়েছে যা ঐতিহ্যগতভাবে অনেক তেলে ভাজা হয়, আপনি চাইনে যেগুলো শ্যালো ফ্রাই করেও প্রস্তুত করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, খুব বেশি ভাজাভুজির বদলে অল্প তেলে ভেজে খান।
  • ভাজাভুজি

  • ঢাকনা দিয়ে রান্নার পাত্র ঢেকে রান্না করলে দ্রুত রান্না হয় কারণ খাবারের আর্দ্রতা রান্নার প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করে, রান্না করার সময় কম পরিমাণে তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • যে সবজি ঐতিহ্যগতভাবে ভাজা হয় যেমন ফুলকপি এবং মটরশুচি ভাজা, এর বদলে ফুলকপি ভাপা করতে পারেন।
  • ভাজাভুজির বদলে বিকল্প হিসেবে ভাপা বা সেদ্ধ করা খাবার বেছে নিন।
  • একটি এয়ার ফ্রায়ার বা ওভেন ব্যবহার করা যেতে পারে বেশ কিছু স্ন্যাকস যেমন সিঙারা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই জাতীয় খাবার তৈরি করার জন্য।

যাইহোক, আপনি যে তেলই ব্যবহার করুন না কেন একটি জিনিস আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে:

পুনরায় গরম করা বা পুনরায় ব্যবহৃত তেল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক

এমনটা অনেক ঘরেই হয়ে থাকে, যদি ভাজাভুজি করার পর তেল বাড়তি থাকে সেই তেল পরে রান্না ব্যবহার করা হয়। সেই তেল দিয়ে তরকারি রান্না এবং ভাজাভুজি করা হয়। যা খুবই ক্ষতিকর। এই পদ্ধতিতে তেল পুনরায় গরম করা এবং পুনঃব্যবহার করলে ফ্রি র‌্যাডিক্যাল বের হয়

ফ্রি র‌্যাডিক্যাল যা শারীরিক অসুস্থতা এবং বার্ধক্য সৃষ্টি করে। পুনরায় গরম করা এবং পুনরায় ব্যবহার করা তেল কার্রসিনোজেনিক, যা মানে এটি ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।

যদিও রান্নার অবশিষ্ট তেল ফেলে দেওয়াটা টাকা নষ্ট বলে মনে হতে পারে, কিন্তু মনে রাখবেন এই তেল খেলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসা করাতে আরও খরচ হতে পারে। তাই সবচেয়ে ভালো রান্নার অবশিষ্ট তেল ব্যবহার না করা।

ক্যান্সার রোগীরা কী খাবার খাবেন, খাদ্য তালিকা কী হবে সেই সম্পর্কে এখানে আরও বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেন।

আরও পড়ুন : নিজেকে সুস্থ রাখার ১৫টি সহজ উপায়

ক্যান্সারের চিকিৎসা সংক্রান্ত যে কোনও সাহায্যের জন্য  9019923339 নম্বরে কল করুন অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন নিকটবর্তী Onco ক্যান্সার কেয়ার সেন্টারে যান, অথবা ডাউনলোড করুন Onco Cancer Care অ্যাপ।

Related Posts

Leave a Comment