ওভারিয়ান ক্যান্সার এবং ওভারিয়ান সিস্টের মধ্যে পার্থক্য

by Team Onco
559 views

 ওভারিয়ান ক্যান্সার (Ovarian Cancer) ডিম্বাশয় ক্যান্সার নামেও পরিচিত। মহিলাদের প্রজনন অঙ্গ ডিম্বাশয়ের মধ্যে এই ক্যান্সার শুরু হয়। এই ধরনের ক্যান্সারে মহিলাদের ওভারিতে ছোট-ছোট পিণ্ড (ওভারিয়ান সিস্ট) তৈরি হয়ে যায়। মহিলাদের প্রজনন প্রণালীতে দুটি ডিম্বাশয় থাকে। ডিম্বাশয়ে প্রতিমাসে ডিম্ব তৈরি হয়, সেইসঙ্গে ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন হরমোন উৎপাদন করে।

এই ক্যান্সারের লক্ষণ এতটায় সাধারণ হয় যে বেশিরভাগ মহিলারা বুঝতে পারেন না যে সেটা ডিম্বাশয় ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। এই ক্যান্সার যতক্ষণ না পেলভিস (Pelvis) এবং পেটে ছড়িয়ে পড়ে ততক্ষণ ধরা পড়ে না। অ্যাডভান্স স্টেজে এই ক্যান্সারের চিকিৎসা করা আরও কঠিন। যদিও প্রথম পর্যায়ে ধরা পড়লে বাঁচানোর সম্ভাবনা বেশি। সাধারণত ডিম্বাশয় ক্যান্সার নিরাময়ের জন্য অস্ত্রোপচার এবং কোমোথেরাপি ব্যবহার করা হয়।

Table of Contents

ওভারিয়ান ক্যান্সার এবং সিস্টের মধ্যে কি পার্থক্য রয়েছে?

আসলে ওভারিয়ান সিস্ট হল তরল পদার্থ থেকে ভরা একটি থলি যা একটি বা উভয় ডিম্বাশয়ে হতে পারে। তবে, ডিম্বাশ্বয়ে সিস্ট মানেই তা ক্যান্সার নয় – যদিও এদের লক্ষণ একই রকমের হতে পারে, যেমন তল পেটে ব্যথা, পেট ফুলে যাওয়া এবং প্রস্রাবের সময় সমস্যা। সিস্ট মহিলাদের মধ্যে ঋতুস্রাবকালীন সময়ে উৎপন্ন হয়। মেনোপজের (Menopause) পর যে সমস্ত মহিলাদের ডিম্বাশয়ে সিস্ট রয়েছে তাদের ক্যান্সার ঝুঁকি বেশি। 

ওভারিয়ান সিস্ট এবং ওভারিয়ান ক্যান্সারের লক্ষণ

অনেক সময় ওভারিয়ান সিস্ট বোঝা যায় না। এর লক্ষণ হালকা থেকে গুরুতর হতে পারে। পেটে ব্যথা এবং পেট ফুলে যাওয়া, যৌন মিলনের সময় ব্যথা, বার-বার প্রস্রাবের মতো সমস্যা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কিছু মহিলাদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত পিরিয়ড, জ্বর ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ক্যান্সার নেই এমন ওভারিয়ান সিস্টের মতো, ক্যান্সারের টিউমার কখনও কখনও কেবলমাত্র সাধারণ লক্ষণ সৃষ্টি করে। শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও তাদের অনুভব করা কঠিন হয়ে ওঠে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে ওভারিয়ান ক্যান্সার নির্ণয় করা বেশ কঠিন।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের লক্ষণ ওভারিয়ান সিস্টের মতোই হয় যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে:

  • পেট ফুলে যাওয়া
  • পেটে চাপ অনুভব এবং ব্যথা
  • প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পেট ভর্তি মনে হওয়া অথবা খাওয়া দাওয়া করতে অসুবিধা
  • বার-বার প্রস্রাব
  • অনিয়মিত পিরিয়ড
  • যৌন মিলনের সময় ব্যথা

যদি আপনি ওভারিয়ান সিস্ট অথবা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার সম্পর্কিত কোনও লক্ষণ অনুভব করেন তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করুন।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের ধরন

কোষের ধরন অনুযায়ী ডিম্বাশয় ক্যান্সারের প্রকৃতি নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি কোষে একটি পৃথক প্রকারের টিউমারে বিকাশ করতে পারে

  • এপিথেলিয়াল টিউমার ডিম্বাশয়ের বাইরের কোষের স্তরে দেখা দেয়। প্রায় 90 শতাংশ ডিম্বাশয় ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এপিথেলিয়াল টিউমার সম্পর্কিত।
  • স্ট্রমাল টিউমার হরমোন সৃষ্টিকারী কোষের মধ্যে বেড়ে ওঠে। ডিম্বগ্রন্থি ক্যান্সারের মধ্যে সাত শতাংশ হল স্ট্রমাল টিউমার।
  • ডিম্বাণু সৃষ্টিকারী কোষের মধ্যে জার্ম সেল টিউমার বিকশিত হয়। যদিও জার্ম সেল টিউমার খুবই দুর্লভ।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের ঝুঁকির কারণ

  • ওভারিয়ান ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস
  • ওভারিয়ান ক্যান্সার সম্পর্কিত জিনের পরিবর্তন, বিআরসিএ 1 বা বিআরসিএ 2
  • স্তন, গর্ভাবস্থা, বা পেটের ক্যান্সারের পুরানো ইতিহাস
  • স্থূলতা
  • কিছু প্রজনন ওষুধ অথবা হরমোন থেরেপির ব্যবহার
  • জন্মাবস্থার কোন ইতিহাস নেই
  • এন্ডোমেট্রিওসিস (endometriosis)

ওভারিয়ান ক্যান্সারের রোগ নির্ণয়

যদি ডাক্তারের মনে হয় যে আপনার ওভেরিয়ান ক্যান্সার হয়েছে, তাহলে সম্ভবত আপনাকে একটি পেলভিক টেস্ট করার পরামর্শ দেবেন। পেলভিক পরীক্ষা থেকে অস্বাভাবিকতা অনুসন্ধান করতে আপনার ডাক্তারের সুবিধা হবে, কিন্তু ছোটো ডিম্বগ্রন্থি টিউমার বোঝা খুবই কঠিন।

আপনার ডাক্তার নিম্নলিখিত পরীক্ষা করানোর পরামর্শও দিতে পারে :

ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ড (TVUS): টিভিইউএস এক প্রকারের ইমেজিং পরীক্ষা করে যা ডিম্বাশয় সহ প্রজনন অঙ্গগুলির মধ্যে টিউমার খুঁজে বের করার জন্য শব্দ তরঙ্গগুলি ব্যবহার করে। যদিও, টিভিইউএস আপনার ডাক্তারকে এটা নির্ণয় করতে সাহায্য করবে না যে সেটা টিউমার ক্যান্সার কিনা।

পেট এবং পেলভিক সিটি স্ক্যান: যদি আপনি ডাই থেকে অ্যালার্জি থাকে, তাহলে ডাক্তার আপনাকে পেলভিক এমআরআই স্ক্যান করাতে বলতে পারেন।

CA-125 টেস্ট রক্ত পরীক্ষা ক্যান্সার প্রতিজন 125 (CA-125) এর স্তর মাপার জন্য: CA-125 টেস্ট একটি বায়োমার্কার, CA 125 পরীক্ষা রক্তে CA 125 (ক্যান্সার অ্যান্টিজেন 125) প্রোটিনের পরিমাণ পরিমাপ করে। ওভারিয়ান ক্যানসার এবং অন্যান্য প্রজনন অঙ্গের ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়।

বায়োপসি: বায়োপসিতে ডিম্বাশয় থেকে টিস্যুর একটি ছোটো নমুনা অপসারণ করা হয় এবং মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।

ওভারিয়ান সিস্টের প্রকার

বিভিন্ন ধরনের ওভারিয়ান সিস্ট হতে পারে, যেমন কি ডার্মোয়েড সিস্ট এবং এন্ডোমেট্রিয়োমা সিস্ট। যদিও, ফাংশনাল সিস্ট সব থেকে সাধারণ ধরনের। দুই প্রকারের ফাংশনাল সিস্টে ফলিকিউলার এবং কর্পাস লুটিয়াম সিস্ট অন্তর্ভুক্ত।

ফলিকিউলার সিস্ট

মহিলাদের রজঃস্রাব চক্র চলাকালীন সময়ে, একটি ডিম্বাণু তার ফলিকল থেকে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব নীচের দিকে নামতে থাকে। কিন্তু যদি ফলিকলগুলি না ভাঙে অথবা ডিম্বাণু নিঃসরণ না করে আরও বাড়তে থাকে তখন ফলিকিউলার সিস্ট তৈরি হয়।

কর্পাস লুটিয়াম সিস্ট

ফলিকল যখন ডিম্বাণু নিঃসরণ করে, তখন এটি যার জন্য প্রোজেস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন উৎপাদন করে, তাকে কর্পাস লুটিয়াম বলে। কখনও কখনও এই ফলিকলে তরল পদার্থ জমাট বেঁধে যায়, তখন সিস্ট তৈরি হতে পারে।

ওভারিয়ান সিস্টের লক্ষণ

অনেক সময় ওভারিয়ান সিস্টের তেমন কোনও লক্ষণ থাকে না। যদিও, সিস্ট বাড়লে লক্ষণ দেখা দিতে পারে। লক্ষণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে:

  • পেট ফুলে যাওয়া
  • মল ত্যাগ করার সময় ব্যথা
  • মাসিক চক্রের আগে অথবা মাসিক চক্রের সময় পেলভিকে ব্যথা
  • যৌন মিলনের সময় ব্যথা
  • পিঠের নীচের অংশে বা থাইয়ে ব্যথা
  • স্তনে হালকা ব্যথা
  • মাথাঘোরা এবং বমি

ওভেরিয়ান সিস্টের গুরুতর লক্ষণ যেগুলির নিয়মিত চিকিৎসা করা প্রয়োজন তার মধ্যে হল:

  1.  গুরুতর বা অসহ্য পেলভিক ব্যথা
  2. জ্বর
  3. মাথাঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
  4. জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়া

ওভারিয়ান সিস্টের রোগ নির্ণয়

আপনার ডাক্তার নিয়মিত পেলভিক পরীক্ষা করার সময় ওভারিয়ান সিস্টের অনুসন্ধান করতে পারেন। আপনার ডিম্বাশয়ে ফোলাভাব অনুভব করতে পারেন এবং সিস্টের উপস্থিতি সুনিশ্চিত করতে আল্ট্রাসাউন্ড টেস্ট করার কথা বলতে পারেন।

আল্ট্রাসাউন্ড টেস্ট (অ্যাল্ট্রাসোনোগ্রাফি) হল একটি ইমেজিং পরীক্ষা যা আপনার আভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির একটি চিত্র তৈরি করার জন্য উচ্চ মাত্রার শব্দ তরঙ্গগুলি ব্যবহার করে। আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা একটি সিস্টের আকার, স্থান এবং কাঠামো (কঠিন বা তরল পদার্থ দ্বারা পূর্ণ) নির্ধারিত করতে সাহায্য করে।

ডিম্বগ্রন্থির সিস্ট নির্ণয় করার জন্য ব্যবহৃত ইমেজিং টুলসগুলি হল:

সিটি স্ক্যান: একটি বডি ইমেজিং ডিভাইস যা আভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির ক্রস-সেকশনাল ইমেজ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়।

এমআরআই: একটি পরীক্ষা যা আভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির গভীর থেকে ভিডিও উৎপাদন করার জন্য চুম্বকীয় ক্ষেত্রর ব্যবহার করা হয়।

আল্ট্রাসাউন্ড ডিভাইস: ডিম্বাশয়কে দেখার জন্য ব্যবহৃত একটি ইমেজিং ডিভাইস।

আরও পড়ুন : কী কারণে বাড়ছে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি?

(https://thebiem.com)

(insiderlyfe.com)

Related Posts

Leave a Comment